Sunday, 20 October 2013

কে হবেন ‘সর্বদলীয় সরকারের’ প্রধান?

কে হবেন ‘সর্বদলীয় সরকারের’ প্রধান?

আসিফ নজরুল | আপডেট: ০০:৪১, অক্টোবর ২০, ২০১৩ | প্রিন্ট সংস্করণ @ Prothom-alo
কার্টুন:তলিপ্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ১৮ অক্টোবরের ভাষণ শুনে আমাদের শ্রদ্ধেয় কিছু ব্যক্তি খুবই আশাবাদী হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে অগ্রগণ্য ব্যারিস্টার রফিক-উল হক। গতকাল প্রথম আলোকে তিনি বলেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সর্বদলীয় সরকার গঠনের যে প্রস্তাব দিয়েছেন, এর চেয়ে উত্তম আর কিছু হতে পারে না। বিরোধী দলের উচিত হবে প্রধানমন্ত্রীর এই প্রস্তাব গ্রহণ করা।’
দেশে যা অবস্থা, তাতে রফিক-উল হকের মতো সবারই আশাবাদী হতে ইচ্ছা করে। কিন্তু তাঁর মতো আশাবাদী হওয়ার সদ্গুণ সবার নিশ্চয়ই নেই। আমি বরং সবিনয়ে বলতে চাই, সবাই আশাবাদী হয়ে উঠলে এবং তা বাস্তবোচিত না হলে তাতে মানুষ বিভ্রান্ত হতে পারে, ক্ষমতাসীনেরা ভুল বার্তা পেতে পারেন এবং এতে ভারসাম্যমূলক রাজনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা বিলীন হতে পারে। আমি মনে করি, প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাবে ভালো কিছু দিক আছে, কিন্তু এর চেয়ে উত্তম প্রস্তাব দেওয়ার সুযোগ অবশ্যই তাঁর ছিল।
প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনকালে সর্বদলীয় সরকার গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন, এটি খুব অভিনন্দনযোগ্য। তিনি আলোচনার মাধ্যমে নির্বাচনের তারিখ ঠিক করার কথা বলেছেন, এটিও আশাব্যঞ্জক। কিন্তু সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য সবচেয়ে যা জরুরি, তা হচ্ছে নির্বাচনকালীন (সর্বদলীয় বা অন্য যেকোনো) সরকারের প্রধান যিনি হবেন, তাঁর নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা। শেখ হাসিনা তাঁর ভাষণে এই সরকারের প্রধান হিসেবে তাঁর বদলে অন্য কাউকে নিয়োগ দেওয়ার সুযোগ আছে, এমন কোনো ইঙ্গিত প্রদান করেননি। তিনি যদি এ নিয়ে আলোচনার সুযোগ আছে বলতেন বা অদূর ভবিষ্যতেও যদি বলেন, তাহলেই একটি সত্যিকারের সমাধানের পথ প্রশস্ত হবে। তিনি তা কখনো বলেননি। তাঁর সর্বশেষ ভাষণ শুনে বরং মনে হয়েছে, নির্বাচনকালীন সরকারের প্রধান হিসেবে তিনি নিজেই বহাল থাকবেন। যদি তা-ই হয়, তাহলে সেই সরকারে বিএনপির মন্ত্রীরা থাকলেও তাঁরা নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে পারবেন, এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। সর্বদলীয় সরকার গঠনের উদ্দেশ্য যদি হয় নির্বাচনকালে সরকারের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা, তাহলে শেখ হাসিনা (বা খালেদা জিয়ার) নেতৃত্বাধীন ‘সর্বদলীয় সরকার’ তা করতে পারবে—এই ধারণার তেমন কোনো ভিত্তি নেই।
আমরা এ প্রসঙ্গে ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অভিজ্ঞতা স্মরণ করতে পারি। সেই সরকারের প্রধান ছিলেন একজন অরাজনৈতিক, কিন্তু বিএনপির মনোনীত রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ। তিনি বিএনপির কথা অনুসারে চলতেন বলে বাকি উপদেষ্টারা নিরপেক্ষ ও নির্দলীয় হওয়া সত্ত্বেও সেই সরকার নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে ব্যর্থ হচ্ছিল। একপর্যায়ে সেই সরকার ভেঙে দিয়ে নিরপেক্ষ একজন ব্যক্তিকে প্রধান করে নির্বাচনকালীন সরকার পুনর্গঠন করতে হয়েছিল। বিএনপিপন্থী ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ নির্বাচনকালীন সরকারের প্রধান হয়ে যেমন এককভাবে সরকার চালিয়েছিলেন, আওয়ামী লীগের একচ্ছত্র নেত্রী শেখ হাসিনা আগামী নির্বাচনের জন্য সর্বদলীয় সরকারের প্রধান হলে তাঁর পক্ষেও বিএনপির দু-চারজন মন্ত্রীর মতামত উপেক্ষা করে সরকার পরিচালনা করা সম্ভব হবে। ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের পক্ষে সংবিধান, রাজনৈতিক দল ও অনুগত মন্ত্রী কিছুই ছিল না। শেখ হাসিনার পক্ষে বর্তমান সংবিধান, আওয়ামী লীগ ও মহাজোট এবং সর্বদলীয় সরকারের অধিকাংশ মন্ত্রী থাকার কারণে আরও বাধাহীনভাবে বিএনপির মন্ত্রীদের উপেক্ষা করা সম্ভব হবে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশের সংবিধান অনুসারে সরকারের সব ক্ষমতার মালিক আসলে প্রধানমন্ত্রী। বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতিকে ভারতের মতো মন্ত্রিসভার পরামর্শ অনুসারে নয়, প্রধানমন্ত্রীর একক পরামর্শ অনুসারে কাজ করতে হয়। অন্য মন্ত্রীদের মন্ত্রিত্ব সম্পূর্ণভাবে প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছাধীন বলে তাঁরাও প্রধানমন্ত্রীর কথার বাইরে একচুল নড়তে পারেন না। প্রধানমন্ত্রী সংসদ নেত্রী বলে কার্যত সংসদেরও প্রধান। তিনি একচ্ছত্রভাবে দলীয় প্রধান বলে কে স্পিকার হবেন বা কে রাষ্ট্রপতি হবেন—এগুলোসহ সব রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত তিনিই কার্যত নির্ধারণ করেন। আবার দলীয়করণ প্রক্রিয়ায় মূলত প্রধানমন্ত্রীর মাধ্যমেই ঠিক হয় জনপ্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনে গুরুত্বপূর্ণ পদে কারা আসীন থাকবেন। এমন একটি সরকারকাঠামোতে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন নির্বাচনকালীন সরকার (তা যদি সর্বদলীয় সরকারও হয়) নিরপেক্ষভাবে কাজ করবে, এটা যে প্রধান বিরোধী দল বিশ্বাস করবে, তা আশা করা বাস্তবোচিত নয়। ১৯৯৬ সালে তখনকার বিরোধী দল আওয়ামী লীগ সে কারণেই প্রস্তাবিত সর্বদলীয় সরকারের প্রধান খালেদা জিয়া হবেন, এটি কিছুতেই মেনে নেয়নি। তখনকার আওয়ামী লীগের অবস্থানকে যে কারণে নাগরিক সমাজ যৌক্তিক মনে করেছিল, একই কারণে এখনো আমাদের বোঝা উচিত, কেন এমন একটি সরকারের প্রধান পদে আওয়ামী লীগের নেত্রীকে বিএনপির পক্ষে মেনে নেওয়া দুষ্কর।
রফিক-উল হক বলেছেন, ‘(সর্বদলীয় সরকারের) মন্ত্রিপরিষদ চাইলে শেখ হাসিনা সরকারপ্রধান থাকবেন, না চাইলে অন্য কেউ থাকবেন। বিষয়টি নিয়ে আর বিতর্ক করার সুযোগ নেই। এতে সমস্যা আরও বাড়বে।’ আমি সবিনয়ে বলছি, এ নিয়ে এখনই আলোচনা ও নিষ্পত্তি না হলেই বরং সমস্যা আরও বাড়বে। সর্বদলীয় সরকার হলে আওয়ামী লীগ ও তার মিত্রদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি, অবধারিতভাবে তারা শেখ হাসিনাকেই সরকারপ্রধান হিসেবে চাইবে। সে ক্ষেত্রে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন অধিকাংশ আওয়ামী লীগ সদস্যসংবলিত নির্বাচনকালীন সরকার নিরপেক্ষভাবে কাজ করবে—এটি বিএনপির জন্য বিশ্বাস করা কি ইতিহাসসম্মত হবে? আর নির্বাচনকালীন সরকারে যদি সরকার ও বিরোধী দলের সমান সদস্য থাকেন, তাহলে তাঁরা কি শেখ হাসিনাকে সেই সরকারের প্রধান না করার ব্যাপারে একমত হবেন? বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে তা আদৌ সম্ভব কি?
আমি রফিক-উল হকের সঙ্গে একমত যে সংঘাত এড়ানোর স্বার্থে বিএনপির উচিত তত্ত্বাবধায়ক বা নির্দলীয় সরকারের দাবি থেকে সরে এসে সর্বদলীয় সরকারের প্রস্তাব গ্রহণ করা এবং স্পষ্টভাবে বলা যে এই সরকারের প্রধান হিসেবে একজন গ্রহণযোগ্য নিরপেক্ষ ব্যক্তিকে মনোনীত করতে হবে। আওয়ামী লীগের উচিত এ লক্ষ্যে অবিলম্বে আলোচনার উদ্যোগ নেওয়া। সংবিধানকাঠামোর মধ্যেই এ প্রশ্নের সুরাহা সম্ভব। সংবিধানের আলোকে সর্বদলীয় সরকারে ফজলে হাসান আবেদ, বিচারপতি মাহমুদূল আমীন চৌধুরী অথবা আকবর আলি খানের মতো এক বা একাধিক নিরপেক্ষ নির্দলীয় ব্যক্তিকে রাখা সম্ভব। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি চাইলে কোনো উপনির্বাচনের মাধ্যমে সেই নিরপেক্ষ ব্যক্তিকে স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচিত করে আনাও সম্ভব। সে ক্ষেত্রে তাঁকে নির্বাচনকালীন সরকারের প্রধান করার পথে আর কোনো সাংবিধানিক বাধাও থাকবে না।
নির্দলীয় ব্যক্তি প্রশ্নে সমঝোতা না হলে প্রধান দুই দল সংসদে একমাত্র স্বতন্ত্র সদস্য ফজলুল আজিমকে নির্বাচনকালীন সরকারের প্রধান করা যায় কি না, তা-ও ভেবে দেখতে পারে। সর্বদলীয় সরকারের প্রধান সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হলে নির্বাচন নিয়ে অন্যান্য সংকট (যেমন: নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা, নির্বাচনের সময়, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি ইত্যাদি) দূর করা সহজতর হবে।
আমার মনে হয় না, সর্বদলীয় সরকারে প্রধানমন্ত্রী কে হবেন, এই প্রশ্নে দুই দলের সমঝোতা না হলে সবার অংশগ্রহণে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য কোনো নির্বাচন অনুষ্ঠিত করা সম্ভব হবে। এ নিয়ে তাই আলোচনা শুরু করা উচিত এখনই। ২৫ অক্টোবরের পর থেকে দেশে বিরাজমান রাজনৈতিক সংকটের সঙ্গে সঙ্গে নির্বাচন অনুষ্ঠান নিয়ে সাংবিধানিক সংকটও শুরু হবে। দুই প্রধান দলের সমঝোতায় পৌঁছাতে যত দেরি হবে, এই সংকট ততই ঘনীভূত হবে।

সরকারের সদিচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন

সরকারের সদিচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন

প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ রাজনৈতিক অঙ্গনে আশার সঞ্চার করলেও গতকাল ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করার ঘোষণায় কিছুটা হতাশা ও উত্তেজনা দেখা দিয়েছে।
গত শুক্রবার জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্বাচনকালীন সর্বদলীয় সরকার গঠনের পাশাপাশি আলোচনারও প্রস্তাব দিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, নির্বাচনকালীন সরকার-পদ্ধতি নিয়ে সৃষ্ট সংকট আলোচনার মাধ্যমে সমাধানে প্রধানমন্ত্রী যে প্রস্তাব দিয়েছেন, তাতে সংকট নিরসনে সরকারের সদিচ্ছা স্পষ্ট ছিল। কিন্তু গতকাল পুলিশের ঘোষণার পর সেই সদিচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। পুলিশের এই পদক্ষেপ রাজনৈতিক পরিস্থিতি জটিল করবে বলে তাঁরা মনে করেন।
ডিএমপির ঘোষণায় আজ রোববার সকাল ছয়টা থেকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ঢাকা মহানগরে সব ধরনের সভা-সমাবেশ-মিছিল, অস্ত্র বহন নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
প্রধান বিরোধী দল বিএনপি পুলিশের ঘোষণার ফলে সৃষ্ট পরিস্থিতিকে ‘চরম অগণতান্ত্রিক’ ও রাজনৈতিক সংকট নিরসনে সরকারের দ্বিমুখী নীতির নিকৃষ্ট বহিঃপ্রকাশ বলে অভিহিত করেছে। দলটির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এক বিবৃতিতে বলেছেন, সরকার এখন ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে জনগণের পরিবর্তে পুলিশ-নির্ভর হয়ে পড়েছে। তিনি সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণার নিন্দা জানিয়ে এ সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের আহ্বান জানান।
এদিকে গত রাতে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সভা চলাকালে বাইরে এসে মির্জা ফখরুল সাংবাদিকদের জানান, রাজধানীতে সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করার প্রতিবাদে আজ রোববার সারা দেশে জেলায় জেলায় বিক্ষোভ-সমাবেশ ও মিছিলের কর্মসূচি দিয়েছে বিএনপি। রাজধানী ঢাকায় এ কর্মসূচি পালন করা হবে কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, সেটা কাল (রোববার) দেখতে পারবেন।
২৫ অক্টোবর বিএনপির পাশাপাশি রাজপথে থাকার ঘোষণা ছিল আওয়ামী লীগেরও। পুলিশের ঘোষণার পর সরকারি দলের সেই ঘোষণা বহাল থাকবে কি না, জানতে চাইলে মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী বলেন, তাঁরা আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকবেন।
এ ছাড়া জাতীয় পার্টি, জামায়াতে ইসলামী, ওয়ার্কার্স পার্টি, সিপিবি-বাসদ, বাম মোর্চা ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করার নিন্দা ও সমালোচনা করেছেন। তাঁরা একে অপ্রয়োজনীয় ও পরিস্থিতি জটিলতর করার একটি প্রয়াস বলে অভিহিত করেছেন।
জানতে চাইলে বিশিষ্ট আইনজীবী রফিক-উল হক প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিএনপি অনেক আগে থেকেই ২৫ অক্টোবর ঢাকায় সমাবেশের কথা বলে আসছে। এরপর গত শুক্রবার প্রধানমন্ত্রী জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে একটা সুন্দর সমঝোতার প্রস্তাব দিলেন। আমরা আশা করেছিলাম, বিএনপি তাদের স্থায়ী কমিটির সভার পর এ ব্যাপারে ইতিবাচক সাড়া দেবে। কিন্তু পুলিশের নিষেধাজ্ঞা সার্বিক পরিস্থিতি অন্য রকম করে দিয়েছে। এখন বিএনপি বলতে পারে যে, প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাব, আলোচনার আহ্বান সবই সাজানো। তাই তারা সমঝোতার পথ থেকে সরে যেতে পারে। তাতে রাজনৈতিক পরিস্থিতি জটিলতর হবে।
পুলিশি ঘোষণা কেন: রাজনৈতিক সংকট নিরসনে প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাবের পরদিনই পুলিশ ঢাকায় সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করার ঘোষণা কেন দিল, জানতে চাইলে পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, গোয়েন্দাদের কাছে তথ্য রয়েছে, বিরোধী দলের নেতা-কর্মীরা সমাবেশের নামে সড়ক দখল করে স্থায়ীভাবে অবস্থান করতে শুরু করবেন। তাই কেউ যাতে কোথাও অবস্থান নিতে না পারেন, সে ব্যাপারে পুলিশকে সতর্ক থাকতে বলা হয়।
গতকাল শনিবার সকালে ডিএমপি কমিশনারের কার্যালয়ে রাজধানীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে বৈঠক হয়। বৈঠকে সব থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি), উপ-কমিশনার, যুগ্ম কমিশনার ও অতিরিক্ত কমিশনাররা উপস্থিত ছিলেন। রাজনৈতিক কর্মসূচির সময় কীভাবে পুলিশ দায়িত্ব পালন করবে, তা নিয়ে সভায় আলোচনা হয়। সভার পরই নিষেধাজ্ঞা জারির আদেশ দেন কমিশনার।
ডিএমপির জনসংযোগ বিভাগের উপ-কমিশনার মাসুদুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ২০ অক্টোবর থেকে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি ছাড়া আরও কয়েকটি রাজনৈতিক দল সভা-সমাবেশের অনুমতি চেয়ে পুলিশের কাছে আবেদন করেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০ অক্টোবর থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করেছেন পুলিশ কমিশনার।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০ থেকে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত পরস্পরবিরোধী মোট ১২টি সংগঠন ঢাকায় সভা-সমাবেশের জন্য পুলিশের অনুমতি চেয়েছে।
আজ রোববার বিকেলে বিএনপির চেয়ারপারসন ও বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়ার সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদের জাতীয় কনভেনশনে প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে। বেলা দুটো থেকে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠানটি হওয়ার কথা। এ অনুষ্ঠান পুলিশের নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়বে কি না, জানতে চাইলে ডিএমপির তেজগাঁও অঞ্চলের উপ-কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকার প্রথম আলোকে বলেন, এটিও সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধের আওতায় পড়বে। তিনি বলেন, ‘এই অনুষ্ঠান হতে পারবে বলে আমরা মনে করি না।’
তবে রাতে বিএনপির চেয়ারপারসনের প্রেস উইংয়ের কর্মকর্তা শামসুদ্দিন দিদার সাংবাদিকদের বলেন, আজ বেলা তিনটায় খালেদা জিয়া সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদের অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন।
এদিকে ক্ষমতাসীন মহাজোটের শরিক জাতীয় পার্টির (জাপা) মহাসচিব এ বি এম রুহুল আমিন হাওলাদার প্রথম আলোকে বলেন, সভা-সমাবেশ করা যেকোনো দলের গণতান্ত্রিক অধিকার। হঠাৎ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে সভা-সমাবেশ বন্ধ করে দিলে সরকারের সঙ্গে বিরোধী দলের দূরত্ব আরও বাড়বে।
মহাজোটের আরেক শরিক ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বলেন, ‘ঢাকা মহানগর পুলিশের এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার কোনো প্রয়োজন দেখছি না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাষণের পর রাজনৈতিক অঙ্গনে একটা ইতিবাচক পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছিল। পুলিশের এই পদক্ষেপ সেটা বিঘ্নিত করতে পারে।’
জামায়াতে ইসলামীর ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল রফিকুল ইসলাম খান এক বিবৃতিতে বলেছেন, মিছিল, সভা-সমাবেশ করা প্রত্যেক নাগরিকের সাংবিধানিক, গণতান্ত্রিক ও মৌলিক অধিকার। সরকার নাগরিক অধিকার হরণ করে গণতন্ত্র ও সংবিধানকে পদদলিত করেছে। দেশের মানুষ সরকারের এ অগণতান্ত্রিক, অসাংবিধানিক ও স্বৈরাচারী ঘোষণা প্রতিহত করবে।
সিপিবি-বাসদের নেতারা বলেছেন, সভা-সমাবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে সরকার জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকারের ওপর সরাসরি হস্তক্ষেপ করছে। দেশকে রাজনৈতিক সংকট ও অনিশ্চয়তার পরিবেশ থেকে মুক্ত করার জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ না নিয়ে সরকার উল্টো পথ ধরেছে।
সিপিবি-বাসদের এক সভায় নেতারা এ কথা বলেন। গতকাল মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমের সভাপতিত্বে সিপিবির কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত ওই সভায় অন্যান্যের মধ্যে বাসদের খালেকুজ্জামান, সিপিবির সৈয়দ আবু জাফর প্রমুখ বক্তব্য দেন।
গণতান্ত্রিক বাম মোর্চা অনতিবিলম্বে অসহিষ্ণু ও অগণতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত বাতিল করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।
@Prothom-alo

মনমোহনের আসন্ন চীন সফরে ভারতের প্রত্যাশা

মনমোহনের আসন্ন চীন সফরে ভারতের প্রত্যাশা

ভারতের প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিং-এর আসন্ন চীন সফরে দুই দেশের মধ্যে সীমান্ত সুরক্ষা সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে বলে জানা গেছে৷ সেটা বাস্তবায়িত হলে সীমান্ত পরিস্থিতি স্থিতিশীল করতে সেটা হবে একটা মাইলফলক৷
দুদিনের রাশিয়া সফর শেষে তিনদিনের সফরে মনমোহন সিং এর চীন পৌঁছার কথা মঙ্গলবার৷ চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কোচিয়াং সঙ্গে তাঁর বৈঠকের শীর্ষ অ্যাজেন্ডা হলো ভারত-চীন সীমান্তে দীর্ঘদিনের অস্থিরতা, উত্তেজনা, চাপানউতোর ও অনুপ্রবেশ রোধে একটা সন্তোষজনক রফায় আসার জন্য দুদেশের মধ্যে সীমান্ত সুরক্ষা সহযোগিতা চুক্তি সই করা৷ নতুন সীমান্ত প্রতিরক্ষা সহযোগিতার প্রস্তাব এসেছিল চীনের দিক থেকেই৷ প্রস্তাবের মূল খসড়ার কয়েকটি অনুচ্ছেদ নিয়ে ভারতের আপত্তি থাকায় গত কয়েক মাসে ভারত ও চীনের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা স্তরে তিন-চারবার বৈঠক হয়৷ যেমন, চীন চেয়েছিল, সীমান্তে টহলদারির যাবতীয় তথ্যাদি ভারতকে জানাতে হবে৷ শেষে খসড়ায় উভয়পক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্য সংশোধন আনা হয়৷
গত মে মাসে ভারত সফরে গিয়েছিলেন চীনা প্রধানমন্ত্রী লি কোচিয়াং
উল্লেখ্য, ২০০৫ সালে ভারত-চীন সীমান্ত বিরোধ নিষ্পত্তিতে তিন-দফা এক চুক্তির কথা হয়েছিল৷ তাতে উভয়দেশের সম্মতিও ছিল কিন্তু অনিবার্য কারণবশত তা পাথর চাপা পড়ে গিয়েছিল৷ বর্তমান চুক্তি তারই দ্বিতীয় ধাপ অর্থাৎ সীমান্ত বিরোধের চূড়ান্ত মীমাংসা সাপেক্ষে সীমান্ত প্রতিরক্ষা মেকানিজম গড়ে তোলা৷ সম্প্রতি ভারতের লাদাখ এলাকার ডেপসাঙ উপত্যকায় নতুন ধরণের চীনের কথিত ‘অনুপ্রবেশ' এবং ভারত সীমান্তে চীনা টহলদার বাহিনীর অন্যান্য বিতর্কিত গতিবিধি নিয়ে ভারতের দুশ্চিন্তা লাঘবে দুদেশের উচ্চস্তরীয় সামরিক কর্মকর্তাদের মধ্যে বৈঠক হবে যাতে সীমান্তে শান্তি বজায় থাকে এবং দুদেশের মধ্যে আস্থাবর্ধক পদক্ষেপের অঙ্গ হিসেবে কাজ করে৷
কূটনৈতিক সূত্রে বলা হয়েছে, সীমান্ত বরাবর সামরিক পরিকাঠামো মজবুত করার দিকে ভারত নজর দেয়ায় চীনও অস্বস্তিতে৷ যেমন সীমান্তের বিমানবন্দরের আধুনিকীকরণ, ভারি মালবাহী বিমান অবতরণ এবং সুখোই জঙ্গি বিমানের স্কোয়াড্রন গড়ে তোলা, কোর মাইন্টন ডিভিশন তৈরি করা ইত্যাদি৷ প্রসঙ্গত, পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে চীনের বিভিন্ন পরিকাঠামো প্রকল্প বিশেষ করে সামরিক প্রকল্প এবং চীন-পাকিস্তান বেসামরিক পরমাণু চুক্তি সম্পর্কে ভারতের উদ্বেগের কথা তুলে ধরতে পারেন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং৷
মনমোহন-কোচিয়াং বৈঠকের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু অর্থনৈতিক৷ প্রাধান্য পাবে চীন-ভারত বাণিজ্যিক লেনদেনে ভারতের ঘাটতি বাণিজ্যের বিষয়টি৷ দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে ভারতের ঘাটতির পরিমাণ প্রায় তিন হাজার কোটি ডলার৷ চীন চাইছে ডলার বহির্ভূত মুদ্রায় ব্যবসা শুরু করার ব্যবস্থাপনা৷ তবে জানা গেছে বিতর্কিত ভিসা ইস্যু নিয়ে আলোচনা সম্ভবত হবেনা৷
দিল্লি-বেইজিং বৈঠকের ইতিবাচক আবহ তৈরিতে ১৯৫০-এর পর এই প্রথমবার চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিং নৈশভোজে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংকে৷ ইতিবাচক বার্তা দিতেই ক্ষমতা গ্রহণের পরই চীনা প্রধানমন্ত্রী লি কোচিয়াং ভারত সফরে এসেছিলেন৷ বুঝিয়ে দিতে চেয়েছিলেন, দুদেশের নতুন নেতৃত্ব আলোচনার পথেই সমস্যার সমাধান করতে চায়৷ তবে কথায় বলে ‘না আঁচালে বিশ্বাস নেই'৷

DW.DE

AD BANNAR