Thursday, 24 October 2013

বাঙালি হিসেবে প্রতিযোগিতা করা মুশকিল ছিল : মান্না দে

বাঙালি হিসেবে প্রতিযোগিতা করা মুশকিল ছিল : মান্না দে


সিয়াম আনোয়ার
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
বাঙালি হিসেবে প্রতিযোগিতা করা মুশকিল ছিল : মান্না দে
মান্না দে
২৪ অক্টোবর ভোরে না ফেরার দেশে চলে যান কণ্ঠশিল্পী মান্না দে। উপমহাদেশের জনপ্রিয় এ শিল্পীর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এ সাক্ষাৎকারটি প্রকাশ করা হলো। ভারতের বিভিন্ন পত্রিকা ও অনলাইনে প্রকাশিত মান্না দে’র সাক্ষাৎকারগুলো থেকে কিছু প্রশ্ন নির্বাচন করে সাক্ষাৎকারটি সাজানো হয়েছে বাংলানিউজের পাঠকের জন্য।

আপনার মূল নাম কিন্তু মান্না দে নয়?
আমার আসল নাম প্রবোধচন্দ্র। যেটি আমার বাবার দেয়া। কিন্তু আমার পছন্দ হতো না। আমার কাকা এবং গুরু কে সি দে (বিখ্যাত অন্ধ বাঙালি সঙ্গীত পরিচালক) আমাকে সবসময় ডাকনাম মান্না বলেই ডাকতেন। এভাবেই নামটা পছন্দ হয়ে যায়। তার পর কলেজে গিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে নামটা বদলে নেই।

আপনার প্রথম জীবনের স্মৃতি...
আমি একটি সাধারণ গৃহস্থ ঘরের ছেলে।  আমার কাকাই আমাকে টেনে এনে বলেছিলেন গান শেখো। তার নাম কৃষ্ণ চন্দ। অন্ধ ছিলেন। বিয়ে করেননি। ছেলের মত আমাদের মানুষ করেছিলেন। কাকার বদৌলতে ভারতবর্ষের সেরা গায়কগায়িকারা আমাদের বাড়িতে আসতেন। বাড়িতে বসেই তাই সেসব বিখ্যাত লোকদের গান শোনাতে পেরেছিলাম। সব সময় তার সঙ্গে একজনকে থাকতে হতো। এ কারণেই কাকার সঙ্গে কলকাতা থেকে মুম্বাই যাওয়া। তার সঙ্গে দীর্ঘদিন ছিলাম। আমাকে বড় বড় ওস্তাদের কাছে দিলেন। পাশাপাশি ফিল্মেও কাজ করতে লাগলাম। ভেতর থেকে তাড়না ছিল ভারতবর্ষে যত রকম গানবাজনা আছে আমি তা করতে চাই। আর মুম্বাই এমন জায়গা যার মূল কথা সারভাইভ্যাল অব দ্য ফিটেস্ট। কাকাই ছিলেন আমার সঙ্গীত ভুবনের পথপ্রদর্শক। তিনি শিখিয়েছেন কী করে গান করতে হয়। সুর বাঁধতে হয়। কাকা সবসময় বলতেন কান দুটো খোলা রাখবি। ভালো মন্দ দুটোই শুনবি। তা না হলে কোনটা ভালো কোনটা মন্দ সেই পার্থক্যটা বুঝতে পারবি না।

প্রথম প্লেব্যাকের স্মৃতি...?
সুরকার শংকর রাও আমাকে ১৯৪৩ সালে প্রথম গান করার সুযোগ দেন। গানটা আমার কাকাকে করতে বলা হয়। তিনি নিজে না গেয়ে আমাকে দিয়ে গাওয়াতে বলেন। গানটা সিনেমাতে একজন বৃদ্ধ লোক লিপসিং করেন। একজন বিশ বছরের সামান্য বেশি বয়সী ছেলের কণ্ঠে বৃদ্ধের গান। ১৯৪০ এর দিকে প্লেব্যাক গায়করা গান রেকর্ডিংয়ের মূল্যায়ন পেতেন না। যে কারণে প্রথমদিকে গাওয়া আমার অনেক গান কারো মনোযোগ আকর্ষণ করেনি। যেমন গ্রামাফোন রেকর্ডে প্রথমবার আমার নাম আসে মুনা দে। ওই সময় খুব রাগ করেছিলাম।

manna-5আপনার বিখ্যাত বাংলা গান ‘কফি হাউসের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই’ নিয়ে কী স্মৃতি মনে পড়ে?
কফি হাউস আমার বাড়ির খুব কাছেই ছিল। কিন্তু যে কেউ জানলে অবাক হবে, আমি আজ পর্যন্ত কোনদিন কফি হাউসে যাইনি। তবে কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে কফি হাউজের যে ছবিটা গীতিকার গৌরী প্রসন্ন মজুমদার গীতিকবিতায় তুলে ধরেছেন সেটা এক কথায় অসাধারণ। আর তার ওপর নচিকেতার ছেলে খোকা সুন্দর সুর করেছেন। আমি তো কেবল তাদের বানানো জিনিসটাই শ্রোতার কাছে তুলে ধরেছি। সব কৃতিত্ব গৌরী প্রসন্ন মজুমদারের।

বলা হয় যে দাদাসাহেব পালকে পুরস্কার নিজেই পুরস্কৃত যে আপনার মতো মানুষ সে পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন...
এটা শুনতে খুবই ভালো লাগছে। কিন্তু সত্যি হচ্ছে, আমি কখনোই প্রশংসার দিকে তাকাইনি। আমার জীবন গেছে গান গেয়ে গেয়ে। যেখানে আমি আমার পরিতৃপ্তি খুঁজি।


আপনি এখনো নিয়মিত রেওয়াজ করেন?
হ্যাঁ, গান গাওয়াটই আমার লাইফলাইন। আমি পুরনো দাপটেই স্টেজ এ গান করতে চাই। শচীন কর্তা আমাকে সবসময় বলতেন ‘মনটারে তোর তাজা রাখিস’। আমি আমার মনটাকে ইয়ং রাখতে চাই। আমি কখনোই কম্প্রোমাইজ করতে চাই না। আমার ৬০ বছরের সঙ্গীত জীবনে আমি সবসময় একটা নিয়ম শৃঙ্খলার জীবন যাপন করেছি।

manna-4আপনার দুই সন্তানই সঙ্গীতে আগ্রহী। কিন্তু তাদের আপনি কখনোই সঙ্গীতকে পেশা হিসেবে নিতে বলেননি। আপনি কি চাননি সন্তানরা আপনার পথ অনুসরণ করুক?
আমার স্ত্রী ইংরেজি সাহিত্য পড়িয়েছে মুম্বাইতে। আমরা সবসময় আমাদের দুই মেয়েকে শিখিয়েছি অর্ধ-মান-এ কোন কাজ করা হয় না। শিক্ষাই তাদের জন্য প্রাধান্য। আমার বড় মেয়ে রামা খুবই মেধাবী ছাত্রী। সে বিয়ে করে যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী হয়েছে। তার বিয়ের ছয়মাস পরেই সে আমাকে বলল সে পড়ালেখা চালিয়ে যেতে চায়। প্রথমে কম্পিউটার বিজ্ঞান পড়ল। এখন সে একটা কোম্পানির পরিচালক। তার ভালো কণ্ঠ এবং সে সঙ্গীতের ভালো শ্রোতা। আমার ছোট মেয়ে চারটা অ্যালবাম করেছে। সে নিজেই নিজেকে গড়ে নিয়েছে। যদিও তার ভালো কণ্ঠ আছে। সে আমাকে কয়েকবার বলেছে সে পেশাদার সিঙ্গার হতে চায় না।

কেন এমন হল?
সম্ভবত তার মনে হয়েছে সে কখনো লতা মুঙ্গেশকর, গীতা দত্ত বা আশা ভোঁশলের মত খ্যাতি অর্জন করতে পারবে না। খুব কাছ থেকে তাদেরকে দেখে সে নিজের মত করে এগিয়ে গেছে।

আপনার সবচেয়ে কঠিন সমালোচক কে?
আমার স্ত্রী এবং কন্যারা। আমার মনে পড়ে চিম্মিন রেকর্ডিংয়ের কথা। এটা ছিল একটা মুসলমান ছেলে আর হিন্দু মেয়ের ভালোবাসার গল্পের সিনেমা। আমি দক্ষিণে না গিয়ে মুম্বাইতে রেকর্ডিং করেছিলাম। গান রেকর্ডিংয়ের পর আমার মেয়ে আমাকে বলল, বাবা তুমি রাবিশ গেয়েছ। আমার স্ত্রীও কখনো উচ্চারণে ব্যতিক্রম দেখলে ভুল ধরিয়ে দিত।

manna-2আপনার কাকা যখন গান কম্পোজ করে আপনার বদলে মোহাম্মদ রফিকে গান গাওয়ার জন্য দিয়েছিল, আপনি কোন জেলাস অনুভব করেননি?
আমার কাছে খারাপ লাগতে পারত। কিন্তু এটা প্রকাশ করলে আমার দূর্বলতা প্রকাশ পেত। আমি আমার আংকেলের জাজমেন্টকে বিশ্বাস করি এবং রফিকে এসব গান গাওয়ার যোগ্য বলেও মনে করি। রফি আমার চেয়েও ভালো শিল্পী ছিল। সে জন্ম থেকে ইউনিক স্টাইলের। এমন কিছু অবশ্যই আছে যেগুলো আমি যেভাবে গেয়েছি এভাবে হয়তো অন্যরা গাইতে পারতো না। আরেকজন শিল্পী যাকে আমি সত্যিই এপ্রিসিয়েট করি সে হল মেহেদী হাসান। এমনও দিন গেছে যখন আমি মেহেদী হাসানের গজল শুনে নিজে আর গজল গাইতে চাইতাম না।

লতা মুঙ্গেশকর এবং আশা ভোঁশলে- দুজনের সাথেই আপনি গেয়েছেন। তাদেরকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
আশা খুবই ভার্সেটাইল। লতার গান খুবই শান্তিদায়ক। (পিসফুল)

বর্তমান সময়ের গান নিয়ে আপনার মতামত কী?
গান গাওয়াটা এখন সহজ প্রবেশের ব্যাপার হয়ে গেছে। রেওয়াজ, রিহার্সাল তেমন নেই। এখনকার গান শুধুই আইটেম। আপনি কি কাজরা রে শুনেছেন? আমি এটাকে ভালো একটা আইটেম বলব।

নিজেকে কি সঙ্গীতের ধ্রুপদী গায়ক মনে করেন?
না। ওস্তাদ গুলাম আলী খান, ভীমসেন যোশী বা আমির খানের মতে পূর্ণাঙ্গ ধ্রুপদী সঙ্গীত শিল্পী আমি নই। আমি ধ্রুপদী সঙ্গীতে প্রশিক্ষণ নিয়েছি এবং এখনও প্রতিদিন নিয়মিত তিন ঘণ্টা রেওয়াজ করি। আমার কাকা চাইতেন আমি যেন ধ্রুপদী গানে পুরোপুরি জড়িত হই। কিন্তু আমি আগ্রহী ছিলাম না। ধ্রুপদী কেবল একটা শ্রেণীকেই টানে। এর মাধ্যমে সবার কাছে পৌঁছানে খুবই কঠিন।

আপনি কাজ করেছেন এমন সেরা সঙ্গীত পরিচালক কে?
অবশ্যই শংকর-জায়কিশান। পুরো দেশে এই দুজনই সবচেয়ে বৈচিত্রময় সঙ্গীত পরিচালক। সবচেয়ে বেশি সিনেমায় সবচেয়ে বেশি হিট গান সুর করেছে তারা। তারা দুজন আমার গায়কী শক্তিকে সবচেয়ে ভালোভাবে ব্যবহার করেছে। তারা আমাকে দিয়ে রাজকাপুর, রাজকুমার এবং শাম্মী কাপুরদের গান গাইয়ে নিয়েছে। এছাড়া আরো আছে শচীন দেব বর্মন, সলিল চৌধুরী, মদন মোহন, রোশান, রবি, সি রামচন্দ্র এবং আর ডি বর্মন।

manna-1সহকর্মীদের সাথে পেশাগত সম্পর্ক কেমন ছিল আপনার?
আমরা ছিলাম সুস্থ প্রতিযোগী, প্রতিপক্ষ না। রফি ছিল সন্দেহাতীতভাবে শ্রেষ্ঠ প্লেব্যাক সিঙ্গার। মুকেশ তার নাকের টোনের জন্য অতুলনীয়। হেমন্ত কুমার হল স্বর্ণ কণ্ঠের অধিকারী। আর কিশোর ছিল স্বপ্রশিক্ষিত জিনিয়াস। আমার অধিকাংশ ডুয়েট গেয়েছি রফির সাথে। ‘এক চতুর নার’ গান গাওয়ার সময় কিশোরের সাথে আমার প্রতিযোগিতাকে আজকের দিনে অপরিচিত মনে হবে। লতা আশা ভার্সেটাইল এবং শক্তিমান। সন্ধ্যা মুখার্জির ছিল অসাধারণ ক্ল্যাসিক্যাল সঙ্গীত।

বাংলা সিনেমায় উত্তম কুমার আর সৌমিত্র চ্যাটার্জির গান গাইতে আলাদা কিছু মনে হত?
উত্তম ছিল প্রশিক্ষিত মিউজিশিয়ান। তার মিউজিক সেন্স সৌমিত্র’র চেয়ে বেশি ছিল। যদিও উত্তমের কণ্ঠের সাথে হেমন্ত মুখার্জির কণ্ঠের মিল ভালো ছিল। কিন্তু আমার গানও খুব সুন্দর করে মিলিয়ে নিত। উত্তম কুমার আর রাজ কাপুর ছিল লিপ মাস্টার। আর সৌমিত্র গানের অবস্থা বুঝে নিজেকে উপস্থাপন করতে পারত।

দক্ষিণ ভারতের সিনেমাতেও আপনি গান করেছেন। ভিন্ন উচ্চারণের ওই গানে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছেন কীভাবে?
দক্ষিণে অনেক গান মনোবলের সাথেই করেছি। আমার স্ত্রী একজন মালয়ান। স্ত্রী এবং মেয়ে আমাকে সঠিক উচ্চারণ করতে শিখিয়েছে। রেকার্ডিংয়ের আগে ওদের সামনে আমি কয়েকবার রিহার্সাল করে যেতাম। দক্ষিণ ভারতের উচ্চারণে আলাদা একসেন্ট প্রয়োজন। তাদের বর্ণবিশেষে স্বরের উঠানামা আছে যেটা কোনরকম স্টাইল ছাড়াই গাইতে হয়।

মানুষ আপনার বাংলা গান নিয়ে আগ্রহী বেশি...
আমি প্রায় আড়াই হাজারের মত বাংলা গান গেয়েছি। এর মধ্যে নব্বই শতাংশই আমার সুর করা। আপনি হয়তো বিশ্বাস করবেন না পশ্চিম বাংলা এবং বাংলাদেশে সেই গানগুলো এখনো চলে। আমি গাইতে গেলে দেখি তারা আমার সব গানই জানে। আমি গানের কথা ভুলে গেলে তারা মনে করিয়ে দেয়। এটা আমার জন্য আনন্দের যে এখনো অনেক মানুষ আমার গান শোনে, ভালোবাসে।

জীবনের বড় পাওয়া?
আমার জীবনে সবচেয়ে বড় পাওয়া আমার স্ত্রী। কেরালার মেয়ে। মুম্বাই ইউনিভার্সিটি থেকে ইংরেজিতে ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট। ওকে দেখে প্রথম দর্শনে প্রেম বলতে যা বোঝায় তাই হয়েছিল। তারপর একে অপরকে জানলাম, বিয়ে করলাম। যতদিন বেঁচে ছিল ও ছিল আমার সবসময়ের সঙ্গী। শুধু স্ত্রী হিসেবে না,  বন্ধু হিসেবেও সেরা। আমার ফিলোসফার, গাইড, সমালোচক সবই ছিল ও।

manna-3সমসাময়িকদের নিয়ে কী বলবেন?
আমার সমসাময়িক যারা ছিলেন- মোহাম্মদ রফি, মুকেশ, লতা মুঙ্গেশকর, আশা ভোঁশলে- এদের সবারই এমন একটা পরিমন্ডলে জন্ম হয়েছিল যেখানে সর্বভারতীয় গান বাজনা হত। ওরা ওখানে জন্মেছে বলে ওদের জন্য সুবিধার ছিল। একজন বাঙালি হিসেবে তাদের সাথে প্রতিযোগিতা করা আমার জন্য খুব মুশকিল ছিল। তবু আমি সহজে হার মানিনি। ভালো ভালো ওস্তাদের কাছে শিখেছি। আমার যে গায়কি, তাতে সব সময়ই ক্ল্যাসিক্যাল বেজ থাকত। বাংলা গানে আমি যত শক্ত গানই করি, সেটা জনপ্রিয় হয়েছে। কিন্তু হিন্দিতে ব্যপারটা এমন না। সেখানে আমি ছিলাম বহিরাগত। হিন্দি ভাষায় বাঙালি হয়ে গান গাইতাম। যাদের ভাষা ছিল হিন্দি তারা অনেকটাই এগিয়ে ছিল। যেমন রফি ছিল পাঞ্জাবী, হিন্দি উর্দু ওর স্বাভাবিকভাবেই আসত। আমি সেটা মেনে নিয়েছিলাম। কারণ, রফির মতো গায়ক ভারতবর্ষ পায়নি। কিশোর, রফি, বাংলা গানে হেমন্ত ওদের যে ঈশ্বরপ্রদত্ত গলা ছিল তা আমি পাইনি। আমার গলায় আকর্ষণীয় কিছু ছিল না।

এমন কেউ কি আছেন, যার সঙ্গে গান নিয়ে আড্ডা দিতে ইচ্ছে করে?
গুলাম আলী। তার প্রত্যোক গানে বোঝা যায় কী চমৎকার শিক্ষা। রীতিমতো শিখে গান করেছেন। আমি এত শিখতে পারিনি। অনেক শেখাই বাকি রয়ে গেল।

সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে নানান ধরণের গান গাইছেন আপনি...
আমি যদি কেবল একটা ধারায় গান গাইতাম তবে আমি কোথাও থাকতাম না। আমি যেমন রাগ সঙ্গীতে সাবলীল, তেমনি সমানভাবে পপ গাইতে পারি। আবেগময় গান গাইতে পারি। সঙ্গীতের বিভিন্ন ধরণের মেলোডি নিয়ে কাজ করা আমার স্বভাব। আধে দিন আধে রাত সিনেমায় ‘গোরি তোরে বানকে’ গানটি আমি খাটি ভৈরবীতে গেয়েছি। কিন্তু সুরকার চিত্রগুপ্ত গানটির বাজনায় পশ্চিমা ধাচ এনেছেন স্প্যানিশ গিটার, স্নেয়ার ড্রাম ব্যাবহার করে।

শুধু সেই সেদিনের মালী নেই...

শুধু সেই সেদিনের মালী নেই...



শুধু সেই সেদিনের মালী নেই...
মান্না দে
বলিউডের প্লেব্যাকের অন্যতম কিংবদন্তি মোহাম্মদ রফিকে নিজের চেয়ে প্রতিভাবান বলতেন মান্না দে। সেই মোহাম্মদ রফি-ই মৃত্যুর আগে একবার বলেছিলেন ‘সবাই শুনে আমার গান, আমি শুনি মান্না দা’র গান।’
বাংলাদেশের এ সময়ের শ্রোতাদের কাছে তার পরিচিতি ‘কফি হাউসের সেই আড্ডাটা’ কিংবা ‘খুব জানতে ইচ্চে করে’ গানের গায়ক হিসেবে। কিন্তু বাংলা গানের বাইরে অন্য ভাষাতেই মান্না দে বেশি সফল, বেশি জনপ্রিয়। সাত দশকের স্বর্ণালী সঙ্গীত জীবনে মান্না দে গেয়েছেন নানা ভাষায়। বৈচিত্রের বিচারে অনেক সঙ্গীত বিশেষজ্ঞরা তাকে বলেন হিন্দি গানের জগতে সর্বকালের সেরা গায়ক।
মান্না দে’র পারিবারিক নাম প্রবোধ চন্দ্র দে। ১৯১৯ সালের ১লা মে জন্ম নেয়া মান্না দে ৯৪ বছর বয়সে মৃত্যু বরণ করেন ২৪ অক্টোবর। হিন্দি বাংলা মারাঠি গুজরাটি সহ বেশ কটি ভাষায় গান গেয়েছেন সাড়ে তিন হাজারের বেশি। ১৯৫০ থেকে ৭০ এর দশকে বলিউডে প্লেব্যাকে ছিলেন মোহাম্মদ রফি, কিশোর কুমার, মুকেশের মতো সরব। সঙ্গীতে অবদানের জন্য পেয়েছেন ভারতের সর্বোচ্চ সম্মাননা পদ্মশ্রী। সমসাময়িক কেউ না পেলেও একমাত্র শিল্পী হিসেবে ভূষিত হয়েছেন দাদাসাহেব ফালকে সম্মাননায়ও।

চার ভাই ও এক বোনের মধ্যে মান্না দে পিতামাতার তৃতীয় সন্তান। বড় ভাই প্রণব দে এক সময় বাংলার অন্যতম প্রখ্যাত সঙ্গীত পরিচালক ও সঙ্গীত শিল্পী ছিলেন। দ্বিতীয় ভাই প্রকাশ চন্দ্র দে একজন চিকিৎসক ছিলেন। শুধু ছোট ভাই প্রভাষ চন্দ্র দে ছিলেন গান-বাজনার সঙ্গে জড়িত। তবে তাদের মধ্যে মান্না দে বেশি নামধাম করেছেন।
mannadey-ashabhosle
শৈশব জীবন তার কেটেছে কলকাতায়। স্কটিশ চার্চ কলেজিয়েট স্কুল থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকেই আইএ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। কাকা কৃষ্ণচন্দ্রই মান্না দে’র সঙ্গীতানুশীলনে প্রথম প্রেরণা। সঙ্গীত পরিবারে জন্ম বলেই পরিবেশ ও জন্মগত প্রতিভা মান্না দেকে সঙ্গীত অনুশীলনে এক সময় সফলতার পথে নিয়ে যায়। প্রথম দিকে তার বাবা ও কাকা ছেলেদের কোনো দিনই সঙ্গীত প্রতিযোগিতায় যোগদান করার অনুমতি দিতেন না।

কিন্তু সমবয়সী অনেককেই বিচিত্রানুষ্ঠানে বিভিন্ন পদকে পুরস্কৃত হতে দেখে মান্না দে খানিকটা মনে মনে আঘাত পেতেন। পরবর্তী সময়ে কয়েকটি অনুষ্ঠানে যোগদান করে যখন পুরস্কার পেলেন তখন খুশিতে মন ভরে ওঠে। সেটা ছিল ১৯৩২-৩৩ সালের কথা। ১৯৩৭ সালে মান্না দে ইন্টার কলেজিয়েট সঙ্গীত প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়েছিলেন। সঙ্গীত প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হাত থেকেও পদক নিয়েছিলেন। সঙ্গীতে তার হাতে খড়ি কাকা কৃষ্ণচন্দ্র দে এবং ওস্তাদ দবীর খাঁ সাহেবের হাতে।

১৯৪২ সালে কৃষ্ণ চন্দ্র দে’র সাথে মুম্বাইতে আসেন। তার সাথে এবং পরবর্তীতে শচীন দেব বর্মণের সহকারি হিসেবে কাজ করেন। ৪৩-এ হিন্দি এবং ৫২ সালে মারাঠী গান শুরু করেন।
হিন্দিতে মান্না দে র গাওয়া জনপ্রিয় গানের মধ্যে রয়েছে ‘কেতকী গুলাব জুহি’, কিশোর কুমারের সাথে দ্বৈত ‘ইয়ে দোস্তি হাম নেহি তোরেঙ্গে  (শোলে), ‘এক চতুর নার (পদোসান)।
১৯৫৩ সালে কেরালার মেয়ে সুলোচনা কুমারনকে বিয়ে করেন মান্না দে। মুম্বাইতে ৫০ বছরেরও বেশি সময় থাকার পর ব্যাঙ্গালোরে মেয়ের সাথে ছিলেন মান্না দে। গত বছর তার স্ত্রী মারা গেছেন।MANNA-DEY-3
২০০৫ সালে ‘জীবনের জলসাঘরে’ নামে তার আত্মজীবনী বের হয়। পরে ‘মেমরিজ কাম এলাইভ’ এবং ‘ইয়াদেন জি ওথি’ নামে ইংরেজি ও হিন্দিতে এটি অনুদিত হয়।
মান্নাদের সঙ্গীত জীবনের সম্পূর্ণ আর্কাইভ সংরক্ষণ করা আছে মান্না দে সঙ্গীত একাডেমীতে। পাশাপাশি রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয় এবং কলকাতা সঙ্গীত ভবনেও মান্না দে’র সঙ্গীত সংরক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছে। মান্না দে শুধু ভারতেই নয়, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তেও সুপরিচিত।
মান্না দে’র গান নিয়ে একটা কথা চালু আছে যাদের যৌবনের জোয়ার এসেছে তাদের যৌবনের অপর নাম ‘মান্না দে’। সেই অর্ধশতক আগে গেয়েছিলেন ‘ জানি তোমার প্রেমের যোগ্য আমি তো নই, পাছে ভালোবেসে ফেলো তাই দূরে দূরে রই।’ এখনো সেই একই আবেশে মুগ্ধ করে রেখেছে সবাইকে।

তার ৯৪ তম জন্মদিনে শুভেচ্ছা জানাতে কলকাতা থেকে ব্যাঙ্গালোরে ছুটে গিয়েছিলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়। তার কাছে মান্না দে বলেছিলেন ‘আমি একশ বছর বাঁচতে চাই।
বয়স যতই বাড়ুক, এখনও তারুণ্যের ছায়া মান্না দে’র চিন্তায় কথায়। গত বছর কলকাতার এক সাক্ষাৎকারে সাংবাদিককে জিজ্ঞেস করছিলেন `টুইটার ফেসবুক এসব কী আমাকে বোঝাও?` আইপিএল কেমন চলছে এনিয়েও মাথা ঘামাতেন নিয়মিত। খেলা দেখতেন ফুটবলের বড় বড় লীগেরও।

শেষ বয়সে ঘরের মধ্যে ওয়াকার কানে চলাফেরা করতে হয়েছে তাকে।বিমানে চড়তে চিকিৎসকদের নিষেধ আছে। তাই ইচ্ছে থাকার পরেও ব্যাঙ্গালোর থেকে কলকাতায় আসতে পারতেন না ।
কফিহাউজ গানের সেই লাইনটাই আজীবন আওড়াতে হবে ‘একই সে বাগানে আজ এসেছে নতুন কুঁডি, শুধু সেই সেদিনের মালী নেই।`

কফিহাউজ গানের জন্মকাহিনী

কফিহাউজ গানের জন্মকাহিনী


বিনোদন ডেস্ক
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
কফিহাউজ গানের জন্মকাহিনী
গীতিকার গৌরী প্রসন্ন মজুমদার ও মান্না দে
কফিহাউজ গানটি নিয়ে মান্না দে সবসময় নিজের চেয়েও বেশি কৃতিত্ব দেন গীতিকার সুরকারকে। তিনি শুধু গানটা গেয়েছিলেন মাত্র। তার মতে, হেমন্ত গাইলে গানটা সুপারহিট হতো আর শ্যামল মিত্র গাইলে তো হিট। তবে মান্নার কণ্ঠে যে গানটি চিরকালীন পছন্দের তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে সেকথা স্বীকার করে নিয়েছেন গানটির সুরকার সুপর্ণকান্তি।

তবে মান্না দে এ গানটির দ্বিতীয় অংশ হিসেবে ‘স্বপ্নের কফি হাউস’ শীর্ষক একটি গান প্রথম গানটির ঠিক কুড়ি বছর বাদে গেয়েছিলেন। কিন্তু রহস্যময় কারণে সেটি শোনার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন বাঙালি। কফি হাউসের সেই আড্ডাটা গানটির গীতকার গৌরী প্রসন্ন মজুমদারের কথায় সুর দিয়েছিলেন নচিকেতার পুত্র সুপর্ণকান্তি ঘোষ। মান্না দের মতে, গৌরীবাবু লিখেছিলেন দুর্দান্ত। সুরকার সুপর্ণকান্তি অসাধারণ কাজ করেছিলেন। এই গানটির জন্ম কাহিনীটি  বেশ গল্পের মতো।

সময়টা ১৯৮৩ সাল। গীতিকার গৌরী প্রসন্ন মজুমদার তখন আশা ভোঁসলেকে নিয়ে প্রচুর হিট প্রেমের গান লিখে চলেছেন। কিন্তু পূজার গান মান্না দের জন্য তিনি লিখতে পারছেন না। সবই লিখছেন পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়। এ নিয়ে আক্ষেপ ছিল গৌরী প্রসন্নের মনে। এ সময় একদিন নচিকেতা ঘোষের নিউ আলিপুরের বাড়িতে গিয়েছিলেন গৌরী প্রসন্ন। উদ্দেশ্য ছিল  শক্তি ঠাকুরকে দিয়ে একটি গান তোলা।

সেই সময় সেরা জুটি ছিলেন নচিকেতা ও গৌরী প্রসন্ন। সেই সূত্রে নচিকেতার ছেলে সুপর্ণকান্তির সঙ্গেও বেশ ভাল সম্পর্ক। তবে বাড়িতে আসার অনেকক্ষণ পরে সুপর্ণকান্তিকে দেখতে পেয়ে গৌরী প্রসন্ন মজা করেই বলেন, `কী বাইরে আড্ডা মেরে সময় কাটাচ্ছ? এর উত্তরে সুপর্ণকান্তি তার গৌরী কাকাকে বলেন, `কী সব গদগদে প্রেমের গান লিখছো। একটা অন্যরকম গান লিখে দেখাও না। এই আড্ডা নিয়েও তো গান লিখতে পারো।`

এবার গৌরী প্রসন্ন বলেন, তুমি তো অক্সফোর্ডের এমএ হয়ে গিয়েছো। আড্ডা নিয়ে বাংলা গান গাইবে? সুপর্ণ এবার বলে, কেন নয়। কফি হাউসের আড্ডা নিয়েও তো একটা গান লিখতে পারো। গৌরী প্রসন্ন এবার বলেন, তোমার বাবা (নচিকেতা ঘোষ) কি আর সে গান গাইবেন? তর্ক চলছে বটে কিন্তু গৌরী প্রসন্ন এরই মধ্যে মনে মনে তৈরি করে ফেলেন দুটি লাইন।

এরপরেই সুপর্ণকান্তিকে বললেন, লিখে নাও- ‘কফি হাউসের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই/ কোথায় হারিয়ে গেল সোনালি বিকেলগুলো সেই।’ সুপর্ণও সঙ্গে সঙ্গে দুটো লাইনেই সুর দিয়ে শুনিয়ে দেন। উপস্থিত শক্তি ঠাকুর সেবার পূজায় গানটা গাওয়ার জন্য অনুরোধ জানালেও সুপর্ণ রাজি হননি। তিনি সঙ্গে সঙ্গেই ঠিক করে নিয়েছিলেন মান্না দের কথা।

কিন্তু গানের বাকি লাইনগুলো? পরের দিন সকালেই গৌরী প্রসন্নের স্ত্রী সুপর্ণকান্তিকে ফোন দিলেন । সারা রাত জেগে বহুদিন পরে গান লিখেছেন অসুস্থ গৌরী প্রসন্ন। তখনই তিনি ক্যান্সারে আক্রান্ত। দু’দিন পরে গানটা নিয়ে হাজির। কিন্তু শেষ স্তবক যোগ করার পক্ষপাতী ছিলেন না গৌরী প্রসন্ন। সুপর্ণকান্তি চান যোগ করুন একটি স্তবক।
শেষ পর্যন্ত রাজি হন। লেখেন দুর্দান্ত সেই লাইন- ‘সেই সাতজন নেই, তবুও টেবিলটা আজও আছে।’ কিন্তু শেষ তিনটি লাইন তিনি লিখেছিলেন চেন্নাইয়ে চিকিৎসা করাতে যাওয়ার পথে হাওড়া স্টেশনে বসে একটি সিগারেটের প্যাকেটের উল্টো পিঠে। এক চেনা লোকের মাধ্যমে তা পাঠিয়ে দেন সুপর্ণকান্তির কাছে।

তারপর সুপর্ণকান্তির সুরে মুম্বইয়ে গানটি রেকর্ড করেন মান্না দে। তৈরি হয়ে যায় একটা ইতিহাস। তবে কফি হাউসের দ্বিতীয় অংশ হিসেবে পরবর্তী সময়ে ‘স্বপ্নের কফি হাউস’ নামে একটি গান রেকর্ড করেছিলেন মান্না দে। একটি নতুন রেকর্ড কোম্পানিই রেকর্ড করিয়েছিল গানটি। কিন্তু সুপর্ণকান্তি জানিয়েছেন, সেই গানের অরিজিনাল স্পুলটি পাওয়া যায়নি। ফলে অন্য স্পুল দিয়ে কাজ করতে হয়েছিল। নিখিলেশ, মইদুলদের নিয়ে দ্বিতীয় গানটি লিখেছিলেন শমীন্দ্র রায় চৌধুরী। প্রথম গানের স্কেলেই গানটা করেছিলেন মান্না দে। দ্বিতীয় গানটি প্রথমটির থেকেও সুরের বৈচিত্রের বিচারে অনেক ভাল হয়েছিল। কিন্তু কোথায় গেল সেই স্বপ্নের কফি হাউস কেউ জানে না। মান্না দেও হতাশ। তিনি শুধু বলেছেন, বাঙালি তো জানতেই পারল না সেই গানের কথা।


কফি হাউজ নিয়ে মান্না দের দুটি গান আছে। দুটি গান এখানে তুলে ধরা হল বাংলানিউজ পাঠকদের জন্য...

শিল্পী- মান্না দে
কথা- গৌরী প্রসন্ন মজুমদার
সুর- সুপর্ণ কান্তি ঘোষ

কফি হাউজের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই
কোথায় হারিয়ে গেল সোনালী বিকেল গুলো সেই
আজ আর নেই...........................।।

নিখিলেশ প্যারিসে মইদুল ঢাকাতে নেই তারা আজ কোন খবরে
গ্র্যান্ড এর গীটারিষ্ট গোয়ানিস ডি সুজা ঘুমিয়ে আছে যে আজ কবরে
কাকে যেন ভালবেসে আঘাত পেয়ে যে শেষে পাগলা গারদে আছে রমা রায়
অমলটা ধুক্ছে দুরন্ত ক্যান্সারে জীবন করেনি তাকে ক্ষমা হায়।।

সুজাতাই আজ শুধু সবচেয়ে সুখে আছে শুনেছি তো লাখপতি স্বামী তার
হীরে আর জহরতে আগা গোড়া মোড়া সে গাড়ী বাড়ি সব কিছু দামি তার
আর্ট কলেজের ছেলে নিখিলেশ সান্যাল বিজ্ঞাপনের ছবি আঁকতো
আর চোখ ভরা কথা নিয়ে নির্বাক শ্রোতা হয়ে ডি সুজাটা বসে শুধু থাকতো।।

একটা টেবিলে সেই তিন চার ঘণ্টা চারমিনার ঠোঁটে জ্বলতো
কখনো বিষ্ণুদে কখনো যামিনী রায় এই নিয়ে তর্কটা চলতো
রোদ ঝড় বৃষ্টিতে যেখানেই যে থাকুক কাজ সেরে ঠিক এসে জুট্তাম
চারটেতে শুরু করে জমিয়ে আড্ডা মেরে সাড়ে সাতটায় ঠিক উঠতাম।।

কবি কবি চেহারা কাঁধেতে ঝোলানো ব্যাগ মুছে যাবে অমলের নামটা
একটা কবিতা তার কোথাও হলোনা ছাপা পেলো না সে প্রতিভার দামটা
অফিসের সোসালে এমেচার নাটকে রমা রায় অভিনয় করতো
কাগজের রিপোর্টার মইদুল এসে রোজ কি লিখেছে তাই শুধু পড়তো।।

সেই সাতজন নেই আজ টেবিলটা তবু আছে সাতটা পেয়ালা আজো খালি নেই
একই সে বাগানে আজ এসেছে নতুন কুঁড়ি শুধু সেই সেদিনের মালী নেই
কত স্বপ্নের রোদ ওঠে এই কফি হাউজে কত স্বপ্ন মেঘে ঢেকে যায়
কতজন এলো গেলো কতজনই আসবে, কফি হাউজটা শুধু থেকে যায়।।



কফি হাউজ-২

স্বপ্নের মতো ছিল দিনগুলো কফি হাউজেই,
আজ আর নেই
জীবনে চলার পথে হারিয়ে গিয়েছে অনেকেই,
আজ আর নেই
নিখিলেশ লিখেছে প্যারিসের বদলে
এখানেই পুজোটা কাটাবে
কী এক জরুরি কাজে ঢাকার অফিস থেকে
মইদুলকেও নাকি পাঠাবে
একটা ফোনেই জানি রাজি হবে সুজাতা
আসবেনা অমল আর রমা রায়
আমাদের ফাঁকি দিয়ে কবেই তো চলে গেছে
ওদের কখনো কি ভোলা যায়?

স্বপ্নের মতো ছিল দিনগুলো কফি হাউজেই,
আজ আর নেই
জীবনে চলার পথে হারিয়ে গিয়েছে অনেকেই,
আজ আর নেই
ওরা যেন ভালো থাকে একটু দেখিস তোরা
শেষ অনুরোধ ছিল ডিসুজার
তেরো তলা বাড়িতে সবকিছু আছে তবু
কিসের অভাব যেন সুজাতার
একটাও তার লেখা হয়নি কোথাও ছাপা
অভিমান ছিল খুব অমলের
ভালো লাগে দেখে তাই সেই সব কবিতাই
মুখে মুখে ফেরে আজ সকলের

স্বপ্নের মতো ছিল দিনগুলো কফি হাউজেই,
আজ আর নেই
জীবনে চলার পথে হারিয়ে গিয়েছে অনেকেই,
আজ আর নেই
নাম যশ খ্যাতি আর অনেক পুরস্কার
নিখিলেশ হ্যাপি থেকে গিয়েছে
একটা মেয়ে বলে সুজাতা বিয়েতে তার
দুহাত উজার করে দিয়েছে
সবকিছু অগোছালো ডিসুজার বেলাতে
নিজেদের অপরাধী মনে হয়
পার্ক স্ট্রীটে মাঝরাতে ওর মেয়ে নাচে গায়
ইচ্ছে বা তার কোন শখে নয়

স্বপ্নের মতো ছিল দিনগুলো কফি হাউজেই,
আজ আর নেই
জীবনে চলার পথে হারিয়ে গিয়েছে অনেকেই,
আজ আর নেই
কার দোষে ভাঙলো যে মইদুল বলেনি
জানি ওরা একসাথে থাকেনা
ছেলে নিয়ে মারিয়ম কোথায় হারিয়ে গেছে
কেউ আর কারো খোঁজ রাখেনা
নাটকে যেমন হয় জীবন তেমন নয়
রমা রয় পারেনি তা বুঝতে
পাগলা গারদে তার কেটে গেছে শেষ দিন
হারালো সে চেনা মুখ খুঁজতে

স্বপ্নের মতো ছিল দিনগুলো কফি হাউজেই,
আজ আর নেই
জীবনে চলার পথে হারিয়ে গিয়েছে অনেকেই,
আজ আর নেই
দেওয়ালের রঙ আর আলোচনা পোস্টার
বদলে গিয়েছে সব এখানে
তবুও প্রশ্ন নেই,
যে আসে বন্ধু সেই
আড্ডা তর্ক চলে সমানে
সেই স্বপ্নের দিনগুলো বাতাসে উড়িয়ে ধুলো
হয়ত আসছে ফিরে আজ আবার
অমলের ছেলেটার হাতে উঠে এসেছে
ডিসুজার ফেলে যাওয়া সে গীটার

স্বপ্নের মতো ছিল দিনগুলো কফি হাউজেই,
আজ আর নেই
জীবনে চলার পথে হারিয়ে  গিয়েছে অনেকেই,
আজ আর নেই

AD BANNAR