চীনের উভয়সংকট হলো অর্থনীতির উদারীকরণের সঙ্গে নব্য মাওপন্থি রাজনীতির
গাঁটছড়া৷ অর্থনীতির স্বাধীনতা যা-তে মাত্রাধিক না হয়ে পড়ে, সেটা দেখতে
সাতটি মহাপাপের একটি ফিরিস্তি করা হয়েছে৷
চৈনিক রাজনীতির এক আমলের উঠতি তারকা বো শিলাই-এর বিচার প্রক্রিয়া সমাপ্ত
হয়েছে৷ বিগত কয়েক দশকের বৃহত্তম রাজনৈতিক কেলেঙ্কারির উপর যবনিকা টেনে
দেওয়াই ছিল চীনা কমিউনিস্ট পার্টির উদ্দেশ্য৷ বো শিলাই-এর সঙ্গে সঙ্গে
তথাকথিত ‘‘নব্য বামপন্থিদের'' সব আশা-আকাঙ্খা-উচ্চাশাও লৌহকপাটের অন্তরালে
অন্তর্হিত হলো৷
কিন্তু বো শিলাই যে নব্য মাওপন্থি রাজনীতির সূচনা করেছিলেন, তা কিন্তু
বেঁচে আছে৷ সেই রাজনীতিকে যিনি বাঁচিয়ে রেখেছেন এবং আরো এগিয়ে নিয়ে
যাচ্ছেন, তিনি আর কেউ নন – বো শিলাই-এর রাজনৈতিক বৈরি, চীনের নতুন রাষ্ট্র –
তথা সরকারপ্রধান শি চিনপিং৷ এই নীতিতে যার স্বত্বাধিকার, সেই বো সিলাই
কিন্তু আদালতের কাঠগড়ায়৷
মাও সেতুং
নয়া মাওবাদ?
চায়না ওয়াচাররা বেশ কিছুদিন ধরেই খেয়াল করছেন, নতুন চীনা নেতৃত্ব কিভাবে
মাওপন্থি বাগাড়ম্বরের দিকে ঝুঁকছেন৷ গত নভেম্বরে পার্টিপ্রধান নির্বাচিত
হবার পর শি চিনপিং যে রক্ষণশীল পন্থা নিয়েছেন, তাকে নির্দ্বিধায় মাওপন্থি
বলে বর্ণনা করা চলে, বলে শি চিনপিং-এর একটি সাম্প্রতিক জীবনীর রচয়িতা,
হংকং-এর সাংবাদিক উইলি ল্যাম-এর অভিমত৷
১৯৭৬ সালে মাও সে তুং-এর মৃত্যু যাবৎ চীনের আর কোনো রাষ্ট্রপ্রধান মাও-এর
উত্তরাধিকারকে এভাবে তাঁর রাজনীতির নিশান করেননি৷ শি চিনপিং মাও-এর
স্মৃতিসৌধগুলো পরিদর্শন করেছেন৷ মাও-এর ভুল-ভ্রান্তির ঐতিহাসিক
নব-মূল্যায়নের বিরোধিতা করেছেন৷ গত জুন মাসে শি-র সূচিত একটি সুবৃহৎ
‘‘সংশোধনী অভিযানে'' পার্টিকে গোটা এক বছর ধরে তার ‘‘বিলাসিতা'' ও দুর্নীতি
থেকে মুক্ত করা হবে – এ-ও চীনের ‘‘মহান চেয়ারম্যানের'' অনুকরণে৷
শি চিনপিং
যুগপৎ নয়া পার্টি নেতৃত্ব রাজনৈতিক মতাদর্শ ও গণমাধ্যমের উপর নিয়ন্ত্রণ আরো
জোরদার করেছে, বলে উইলি ল্যাম-এর ধারণা৷ ল্যাম এখানে তথাকথিত ‘‘ন'নম্বর
দলিল''-এর কথা উল্লেখ করলেন, যে পেপারটি সারা দেশে পার্টি ক্যাডারদের মধ্যে
বিতরণ করা হয়েছে এবং যে পেপারে রাষ্ট্রীয় রাজনৈতিক মতাদর্শের সাতটি
বৃহত্তম বিপদের কথা বলা হয়েছে৷ নয় নম্বর দলিল অনুযায়ী গণমাধ্যমে কিংবা
স্কুল-কলেজে যে সব বিষয় নিয়ে উচ্চবাচ্য করা চলবে না, তার মধ্যে পড়বে:
সার্বজনীন মূল্যবোধ, সুশীল সমাজ, বিচারবিভাগের স্বাধীনতা কিংবা অতীতে
কমিউনিস্ট পার্টির ভুল-ভ্রান্তি৷
রাজনীতির চাল?
জার্মানির ট্রিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের চীন বিশেষজ্ঞ সেবাস্টিয়ান হাইলমান এই
নতুন মাও-উদ্দীপনাকে অভ্যন্তরীণ রাজনীতির চাল বলে মনে করেন: ‘‘রাজনৈতিক
নেতৃত্ব সমাজের বামঘেঁষা অংশটির সমর্থন সংগ্রহ করতে চান৷'' এবং তা-তে ভুল
কিছু নেই, কেননা একটি সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, দক্ষিণের স্বচ্ছল
গুয়াংডং প্রদেশেও জনগণের ৩৮ শতাংশ বামপন্থি নীতি পছন্দ করে৷ এছাড়া মাও
সংক্রান্ত নস্টালজিয়া তো আছেই৷
আদালতে বো শিলাই
তবে চীনা নেতৃত্বের হালের মাও-আনুগত্য শুধু লোক-দেখানো নয়৷ শি চিনপিং-এর
সরকার বহু ভিন্নমতাবলম্বীদের জেলে পুরেছেন৷ যেমন তথাকথিত ‘‘সংবিধানবাদ''-এর
অনেক নেতৃস্থানীয় প্রতিনিধিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে৷ এই ‘‘সংবিধানবাদিদের''
দোষ বলতে তারা দাবি করেছিলেন যে, সরকার ও প্রশাসনকে দেশের সংবিধানে
নির্দিষ্ট আঙ্গিক মেনে চলতে হবে৷
যে সব নাগরিক অধিকার আন্দোলনকারী দাবি করেছিলেন যে, পার্টি কর্মকর্তাদের
তাঁদের সম্পত্তির খতিয়ান দিতে হবে, তাঁদেরও ভাগ্যে ঐ একই সাজা জুটেছে৷
ওদিকে শি চিনপিং দুর্নীতিদমনকে তাঁর কর্মসূচির একট মূল অঙ্গ বলে ঘোষণা
করেছেন৷ কিন্তু সে কাজে তাঁর সহায় হবে পার্টি ক্যাডার – যার ফলে কমিউনিস্ট
পার্টি সেই চিরাচরিত হেঁয়ালির মুখে পড়েছে: পার্টি নিজেই নিজের নিয়ন্ত্রক
হয় কি করে?
‘‘ডাবল গেম''
অক্টোবরে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির প্লেনারি মিটিং৷ তা-তে
সম্ভবত নতুন সরকারের অর্থনৈতিক সংস্কারের পরিকল্পনা পেশ করা হবে৷ এক্ষেত্রে
স্বদেশে চাহিদা বাড়ানোর উপরেই জোর দেওয়া হবে বলে মনে করা হচ্ছে৷ এছাড়া
শিল্পসংস্থাগুলিকে আরো স্বাধীনতা দেওয়া হবে, যাতে প্রবৃদ্ধি অটুট থাকে৷ এ
সবকে ঠিক বামপন্থি রাজনীতি বলা চলে না৷ হাইলমান এটাকে বলেন ‘‘ডাবল গেম''৷
একদিকে অর্থনৈতিক সংস্কার, অন্যদিকে পার্টির হাত শক্ত করা৷ চীনে অর্থনীতি
আর রাজনীতির যে ডাবল গেম দেং জিয়াও পিং-এর আমল থেকে চলেছে – যোগ করেন
ল্যাম৷